ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসনের জন্য পরিকল্পিত মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের (ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট – এমআরটি) নতুন লাইনের অগ্রাধিকার নিয়ে নতুনভাবে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে যেসব লাইন আগে নির্মাণ করা হচ্ছে, তার থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ লাইন পেছনে রয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে আরও বেশি মানুষের উপকার হবে। জনগণের উপকার ও সার্বিক সুবিধার কথা বিবেচনা করে অন্তর্বর্তী সরকার মেট্রোরেলের অগ্রাধিকার পুনর্গঠন করবে।
পূর্বের পরিকল্পনা ও বর্তমান পরিস্থিতি
ঢাকা মহানগরী ও পার্শ্ববর্তী এলাকার যানজট সমস্যা নিরসনের জন্য বিগত আওয়ামী লীগ সরকার একটি কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) প্রণয়ন করে। এতে ছয়টি এমআরটি লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। প্রথম লাইনের একটি অংশ, এমআরটি-৬, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে উদ্বোধন করা হয়। এরপর আরও কিছু লাইন বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেয়া হলেও, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এই অগ্রাধিকারে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানান, “আমরা মেট্রোরেলের নতুন এমডি নিয়োগের পর অগ্রাধিকার পুনর্বিবেচনা করব। মানুষের উপকারের বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে লাইন নির্ধারণ করা হবে।”
এমআরটি লাইন-৫ এবং লাইন-২-এর তুলনা
মূলত প্রশ্ন উঠেছে, এমআরটি লাইন-৫ (সাউদার্ন রুট) এবং এমআরটি লাইন-২-এর অগ্রাধিকার নিয়ে। বর্তমানে লাইন-৫-এর বাস্তবায়নের কাজ অনেকদূর এগিয়েছে, যেখানে লাইন-২, যা বেশি উপযোগী হতে পারত, পেছনে রয়েছে।
এমআরটি লাইন-৫ (সাউদার্ন রুট) হেমায়েতপুর থেকে শুরু হয়ে গাবতলী, মিরপুর, কচুক্ষেত হয়ে গুলশান এবং ভাটারা হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত যাবে। এই রুটটি বর্তমান মেট্রোরেল লাইনের খুব কাছাকাছি, তবে রুটের পথে বাণিজ্যিক বা শিল্প এলাকা তেমন নেই।
অন্যদিকে, এমআরটি লাইন-২ গাবতলী থেকে শুরু হয়ে নিউমার্কেট, আজিমপুর, মতিঝিল হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত যাওয়ার কথা। এতে শহরের ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকাগুলো ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকার সংযোগ স্থাপন হবে, যা আরও বেশি মানুষের উপকারে আসবে। পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এমআরটি লাইন-২ আগে বাস্তবায়ন করলে ঢাকার যানজট সমস্যা অনেকাংশে কমতে পারে।
বিস্তারিত জানুন: মেট্রোরেল প্রকল্প পরিকল্পনা
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক মনে করেন, মেট্রোরেলের লাইনগুলো নতুন করে যাচাই-বাছাই করা জরুরি। “মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় নির্ধারণ, প্রকল্পের উপযোগিতা, এবং জনসাধারণের প্রয়োজনকে বিবেচনা করতে হবে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ, যেখানে মানুষের প্রয়োজনে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।” তার মতে, বর্তমান সময়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নতুন সমীক্ষার মাধ্যমে অগ্রাধিকার পুনর্গঠন করলে ভবিষ্যতের জন্য আরও লাভজনক ও কার্যকরী হবে।
অগ্রাধিকারের পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়া
গত আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় মেট্রোরেলের অগ্রাধিকার নিয়ে পুনরায় ভাবতে শুরু করে। পরিকল্পনা কমিশন ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠি দিয়েছে, যাতে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন করে মেট্রোরেলের রুট ও অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এই বৈঠকে বলা হয় যে, ছয়টি মেট্রোরেল লাইনের অগ্রাধিকার ঠিক করতে আলাদা করে সমীক্ষা করার পরিবর্তে সমন্বিত বিশ্লেষণের মাধ্যমে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা উচিত ছিল। এতে প্রকৃতপক্ষে কোন লাইন আগে বাস্তবায়ন করা উচিত, তা সঠিকভাবে বোঝা যেত। এছাড়া এমআরটি লাইন-৫ (সাউদার্ন রুট) প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ৫৪ হাজার কোটি টাকা, যেখানে এমআরটি লাইন-২-এর প্রাথমিক ব্যয় ৬০ হাজার কোটি টাকা বলে ধারণা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশের মেট্রোরেল ব্যবস্থাপনা
পরবর্তী পদক্ষেপ
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানান, নতুন এমডি নিয়োগের পর মেট্রোরেলের রুট ও অগ্রাধিকার নিয়ে সমীক্ষা হবে এবং পর্যালোচনার মাধ্যমে মানুষের উপকারকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হবে। নতুন সমীক্ষার মাধ্যমে সঠিকভাবে কোন লাইন আগে নির্মাণ করলে জনসাধারণের জন্য লাভজনক হবে, তা নির্ধারণ করা হবে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের মেট্রোরেল নেটওয়ার্ককে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা এবং শহরের যানজট সমস্যার সঠিক সমাধান বের করার আশা করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
May Be you like this below news
টাঙ্গাইলে ৫ হাজার বই উপহার: আলোকিত মানুষ তৈরির প্রয়াসে বিকাশ ও প্রথম আলোর উদ্যোগ
ছাত্রলীগ ‘সন্ত্রাসবাদী হাসিনার দলের ছাত্রশাখাকে নিষিদ্ধ করল ইউনূস সরকার



Post a Comment